Search This Blog

Tuesday, April 1, 2014

বালকের বাচালতা



পার্থিব সকল সম্পদের তুলনায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সেরাইহা না থাকিলে মনুষ্যদিগের পাশবিক প্রবৃত্তি বহুল পরিমাণে বৃদ্ধি পাইত
স্বভূমির ছোটোনাগপুর খণ্ড বিশেষত ইহার মালভূমি অংশ এই সৌন্দর্যের ভারে অবনত
এক বালক তার কৈশোরে সেই অংশের এক প্রান্তে বাস করিবার নিমিত্ত তাহার মধ্যম অগ্রজ কর্তৃক নীত হয়বালকটি শৈশবাবস্থা হইতেই সম্ভবত পুরুষানুক্রমে স্বল্পভাষী লজ্জাশীল ছিলএই স্থানে উপনীত হইবার কালে তাহার বয়ঃক্রম ১২ বৎসর ছিলঅত্র স্থানে উপস্থিত হইবার পর বালকটির সম্মুখে এই অনাবিল সৌন্দর্যের দ্বার উন্মোচিত হইয়া তাহাকে একেবারে বিমোহিত করিয়া ফেলিল
বালক এই অংশে প্রথম প্রবেশ করে এক নিশীথেতাহার বাসস্থান হইতে তরঙ্গমালার ন্যায় শৈলশ্রেণি এবং সেই ভূধরের পাদদেশে বিস্তৃত অরণ্যানী অবলোকিত হইতপ্রথম প্রভাতে এই দৃশ্য দেখিয়া বালক যেন সহসা আত্মনিমগ্ন হইয়া পড়েস্বল্পভাষী যেন মুখর, বাচালে পরিণত হয়শৈলশ্রেণির সহিত তাহার স্বগত সংলাপ শুরু হয়সেই ভূধর তাহাকে যেন হাতছানি দিয়া আমন্ত্রণ জানায়, সে- সেই আমন্ত্রণ তৎক্ষণাৎ মনে মনে গ্রহন করিয়া রওনা দেয় পাহাড়ের উচ্চ শীর্ষে আরহণ করিবার নিমিত্তদিন কাটিতে থাকেপ্রভাতে উঠিয়া তাহার অর্ধসমাপ্ত পাঠ সাঙ্গ করিয়া বালক তাহাত নূতন বান্ধব দলমার সহিত আলাপ জুড়িয়া দিতক্রমে সাহস বৃদ্ধি পাইতে থাকেবনাঞ্চল অভিযানে বাহির হইবার অনুমতিও সে পায়অতঃপর তাহার দৈনিক দিনযাপনের অংশ হইয়া উঠিল বনভ্রমণআশ্চর্যান্বিত বালক আবিষ্কার করিল বনভ্রমণে না যাইলে দিনটিকেই তাহার অর্থহীন মনে হয়সেই অরণ্যে জলাশয়, প্রস্তরস্তুপ, বিভিন্ন প্রকার ফলাদির বৃক্ষ, শাল, পিয়াল, সেগুন, মহুল ইত্যাদি মহীরুহ দ্বারা আকীর্ণ ছিলবালক কোনদিন হয়ত আম্রের গুটিকা চয়ন করিয়া পরিধেয়র কোঁচড়ে ভরিয়া লইয়া আসিততাহাতে পরিধেয়টি এবং তাহার কর্ণ উভয়ই বিচিত্রবর্ণ ধারণ করিতকোনদিন-বা কোনো প্রস্তরস্তুপে উঠিয়া ভাবিত বিশ্বের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করিয়াছেপ্রকৃতিদেবী তাহাকে সম্পুর্ণরূপে গ্রাস করিয়া ফেলিলেন
নিদাঘে প্রখর রৌদ্রে বালক কোনো বৃক্ষতলে বসিয়া থাকিতপাহাড়ে প্রতিফলিত রৌদ্র তাহার চক্ষু ঝলসাইয়া দিততথাপি এক অমোঘ আকর্ষণে সে শৈলশ্রেণির প্রতি আকৃষ্ট হইয়া বসিয়াই থাকিতনিশীথে এক-একদিন পাহাড়ে দাবানল প্রজ্জ্বলিত হইয়া তাহার মনে এক মিশ্র অনুভূতির জন্ম দিত। (দাবানল কাহাকে বলে বালকের কণিষ্ঠ অগ্রজ ব্যাখ্যা করিয়া দিয়াছিল)। কখনও ভীত, কখনওবা বৃক্ষগুলির প্রতি দয়ার উদ্রেক হইত। ।
এই স্থানে দক্ষিণ-পূর্ব রেলওয়ের একটি স্টেশন ছিলজনপদটির নামেই স্টেশনটির নাম ছিল, যদিও তাহা ওই স্থান হইতে প্রায় এক ক্রোশ দুরবর্তী ছিলএইরূপ মনোহরণ স্টেশন বালক তাহার পরবর্তী জীবনে আরও কয়েকটি দেখিয়াছে, চাইবাসা, ম্যাকলাস্কিগঞ্জ, বারওবারডি, মহুয়ামিলন, ইকরা ইত্যাদি তথাপি বালকমনে প্রথম দেখিবার অভিঘাত এখন স্পষ্টএই স্টেশন হইতেই তাহার প্রথম সঙ্গীহীন অবস্থায় ট্রেনযাত্রা শুরু হয় কৈশোরের প্রান্তসীমায় একদা এই স্টেশন হইতেই ট্রেনে চাপিয়া সে উচ্চশিক্ষা লাভের নিমিত্ত আসানসোল হইয়া রানীগঞ্জ আসে, যদিও তাহা বালকটির কুক্ষিগত হয় নাইআসানসোল হইতে পুনর্বার এই স্থানে ফিরিয়া আসিলেও জীবন-জীবিকার তাড়নায় পুনরায় অন্যত্র গমন করে তাহার শৈশবের স্বর্গ ছাড়িয়া যেমন এক নিশাকালে তাহার আগমণ ঘোটিয়াছিল, তাহার  প্রথম অনেক কিছুর সাক্ষীকে সে আর নিশীথে ছাড়িয়া গেলআগমনের দিনও তাহাকে স্বাগত জানাই নাই, তেমনি বিদায়ের দিনেও কেউ তাহাকে বিদায় দেয় নাই, শুধু সেই অপরূপা প্রকৃতি ছাড়া