Search This Blog

Sunday, March 16, 2014

অঞ্জলি



আমরা অনেক কিছুই শিখতে শিখতে এগোই আবার অনেক কিছুই ভুলতে ভুলতে যাইগাছের ঝরা পাতার মতোকোনোটা থাকে, কোনোটা ঝরে যায়কোনটা যে মনে থাকে আর কোনটা যে ভুলে যাই তা কে জানে
আমারও খুব ভাল মনে নেইআবছা আবছাতখন আমি খুব ছোট্টোসবে লিখতে শিখেছিএকদিন রাতে প্রচন্ড জ্বর এলআমি বেহুঁশ হয়ে পড়েছিলামপরদিন বাবা আমাকে আমাদের গ্রামের কাছাকাছি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে গিয়েছিলেনডাক্তারবাবু ওষুধ দিলেনজ্বর কমল  কিন্তু আমি বিছানা ছেড়ে উঠতে পারলাম নাবিছানা বলতে একটা তালপাতার চাঁটাই আর তার ওপর একটা কাঁথা পাতাকুঁড়েঘরে থাকিএর থেকে ভালো বিছানা আর কোথায় পাবো
আমার বাবার নাম মোহনমোহন হেম্ব্রম। সারাদিন খাটেন, খুব খাটেন, নিজের সামান্য একটু জমি আছে, তাতেইতাতেও আমাদের মাস চলেআমাদের এই পুরুলিয়া জেলার রুক্ষ মাটিতে বছরে একবারই ফসল হয়তাই বাকি মাস সংসার চালাবার জন্য বাবাকে দিনমজুরি করতে হয়
তিনি নিজের জীবনে লড়াই করতে করতে এগোচ্ছিলেন, আমাকে নিয়ে শুরু হল তাঁর নতুন সংগ্রামজ্বর কমলেও কেমন যেন একটা অসুস্থতা আমার শরীরে বাসা নিয়েছিলআমি রোজই একটু একটু করে দুর্বল হয়ে পড়ছিলামবাবা আমাকে খুব ভালোবাসেনতাঁর প্রথম সন্তান আমিতিনি আমাকে নিয়ে নানান উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে, মহকুমা হাসপাতালে, যেখানে যেখানে তাঁর পক্ষে নিয়ে যাওয়া সম্ভব, গেলেনতিনি আমাকে সুস্থ করবেনইকিন্তু লড়াইয়ে তাঁর জেতা হোল নাআমি সুস্থ হলাম, কিন্তু আমার দুটো হাতই অবশ হয়ে গেলআমি অঞ্জলিকিন্তু জীবনে আমার অঞ্জলি দেওয়া হবে না
বাবা একটু হতাশ হলেনআমার দুভাই শুকদেব আর কৃষ্ণপদ তখন খুবই ছোটোমা ফুলমনি আমাদের সবাই আগলে রাখতেনআর একা হলেই দেখতাম লুকিয়ে কাঁদছেনতখন বুঝতে পারিনি, এখন বুঝি তিনি কেন কাঁদতেন
বাবা হতাশ হলেও লড়াই ছাড়েননিআমি তখন লিখতে পারি, পড়তেও পারিকিন্তু আমার যা শারীরিক অবস্থা তাতে লিখব কিভাবে? বাবার লড়াই দেখে আমিও যেন উদ্বুদ্ধ হলামডানহাতে ভর দিয়ে ডানপায়ের আঙুল- কলম চেপে ধরে শুরু করলাম লেখার চেষ্টাআস্তে আস্তে এভাবেই অভ্যস্ত হয়ে গেলামযদিও খুব কষ্ট হয় আমার লিখতে  বাবা আমাকে স্কুলে ভর্তি করে দিলেনগ্রামেরই প্রাথমিক বিদ্যালয়েআমি যেন নতুন জীবন পেলামখুব মন দিয়ে পড়াশুনা করতামএরপর প্রাথমিকের গণ্ডি ছাড়িয়ে মাধ্যমিকআর এবছর মানে ২০১২ তে আমি উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিচ্ছি
আমার পরীক্ষাকেন্দ্র আমাদের গ্রাম থেকে দশ কিলোমিটার দূরেবাবা পরীক্ষার দিন আমাকে সাইকেলে বসিয়ে সেখানে নিয়ে যানপরীক্ষাকেন্দ্রে আমার বসার জন্য মাটিতে শতরঞ্জি বিছিয়ে ব্যবস্থা করা হয়েছেআমি ডানহাতে ভর দিয়ে পায়ে কলম চেপে লিখে পরীক্ষা দিচ্ছিহাজার কষ্ট হলেও আমাকে হার মানলে চলবে নাপরীক্ষায় আমাকে ভাল ফল করতেই হবে
আমাকে পারতেই হবেযত কষ্টই হোক আমি লড়াই ছাড়ব নাআমাকে বড়ো হতেই হবেনিজের পায়ে দাঁড়িয়ে যদি বাবার একটু সাহায্য করতে পারিঅর্থ আর শরীর দুটোই আমার প্রতিবন্ধকতাবাবা লড়ছেন আর্থিক প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে, আমি শারীরিকআমি জানি জয় আমাদের হবেই।
আমি যখন বুড়ি হয়ে যাব, তখন কি স্মৃতির এই পাতাগুলো ঝরে যাবে? মনে কি কিছুই পড়বে না?

No comments:

Post a Comment