আমরা অনেক কিছুই শিখতে শিখতে এগোই আবার অনেক কিছুই ভুলতে ভুলতে যাই। গাছের ঝরা পাতার মতো। কোনোটা থাকে, কোনোটা ঝরে যায়। কোনটা যে মনে থাকে আর কোনটা যে ভুলে যাই তা কে জানে।
আমারও খুব ভাল মনে নেই। আবছা আবছা। তখন আমি খুব ছোট্টো। সবে লিখতে শিখেছি। একদিন রাতে প্রচন্ড জ্বর এল। আমি বেহুঁশ হয়ে পড়েছিলাম। পরদিন বাবা আমাকে আমাদের গ্রামের কাছাকাছি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে গিয়েছিলেন। ডাক্তারবাবু ওষুধ দিলেন। জ্বর কমল। কিন্তু আমি বিছানা ছেড়ে উঠতে পারলাম না। বিছানা বলতে একটা তালপাতার চাঁটাই আর তার ওপর একটা কাঁথা পাতা। কুঁড়েঘরে থাকি। এর থেকে ভালো বিছানা আর কোথায় পাবো।
আমার বাবার নাম মোহন। মোহন হেম্ব্রম। সারাদিন খাটেন, খুব খাটেন, নিজের সামান্য একটু জমি আছে, তাতেই। তাতেও আমাদের ছ’মাস চলে। আমাদের এই পুরুলিয়া জেলার রুক্ষ মাটিতে বছরে একবারই ফসল হয়। তাই বাকি ছ’মাস সংসার চালাবার জন্য বাবাকে দিনমজুরি করতে হয়।
তিনি নিজের জীবনে লড়াই করতে করতে এগোচ্ছিলেন, আমাকে নিয়ে শুরু হল তাঁর নতুন সংগ্রাম। জ্বর কমলেও কেমন যেন একটা অসুস্থতা আমার শরীরে বাসা নিয়েছিল। আমি রোজই একটু একটু করে দুর্বল হয়ে পড়ছিলাম। বাবা আমাকে খুব ভালোবাসেন। তাঁর প্রথম সন্তান আমি। তিনি আমাকে নিয়ে নানান উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে, মহকুমা হাসপাতালে, যেখানে যেখানে তাঁর পক্ষে নিয়ে যাওয়া সম্ভব, গেলেন। তিনি আমাকে সুস্থ করবেনই। কিন্তু এ লড়াইয়ে তাঁর জেতা হোল না। আমি সুস্থ হলাম, কিন্তু আমার দুটো হাতই অবশ হয়ে গেল। আমি অঞ্জলি। কিন্তু এ জীবনে আমার অঞ্জলি দেওয়া হবে না।
বাবা একটু হতাশ হলেন। আমার দু’ভাই শুকদেব আর কৃষ্ণপদ তখন খুবই ছোটো। মা ফুলমনি আমাদের সবাই আগলে রাখতেন। আর একা হলেই দেখতাম লুকিয়ে কাঁদছেন। তখন বুঝতে পারিনি, এখন বুঝি তিনি কেন কাঁদতেন।
বাবা হতাশ হলেও লড়াই ছাড়েননি। আমি তখন লিখতে পারি, পড়তেও পারি। কিন্তু আমার যা শারীরিক অবস্থা তাতে লিখব কিভাবে? বাবার লড়াই দেখে আমিও যেন উদ্বুদ্ধ হলাম। ডানহাতে ভর দিয়ে ডানপায়ের আঙুল-এ কলম চেপে ধরে শুরু করলাম লেখার চেষ্টা। আস্তে আস্তে এভাবেই অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। যদিও খুব কষ্ট হয় আমার লিখতে। বাবা আমাকে স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। গ্রামেরই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। আমি যেন নতুন জীবন পেলাম। খুব মন দিয়ে পড়াশুনা করতাম। এরপর প্রাথমিকের গণ্ডি ছাড়িয়ে মাধ্যমিক। আর এবছর মানে ২০১২ তে আমি উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিচ্ছি।
আমার পরীক্ষাকেন্দ্র আমাদের গ্রাম থেকে দশ কিলোমিটার দূরে। বাবা পরীক্ষার দিন আমাকে সাইকেলে বসিয়ে সেখানে নিয়ে যান। পরীক্ষাকেন্দ্রে আমার বসার জন্য মাটিতে শতরঞ্জি বিছিয়ে ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমি ডানহাতে ভর দিয়ে পায়ে কলম চেপে লিখে পরীক্ষা দিচ্ছি। হাজার কষ্ট হলেও আমাকে হার মানলে চলবে না। পরীক্ষায় আমাকে ভাল ফল করতেই হবে।
আমাকে পারতেই হবে। যত কষ্টই হোক আমি লড়াই ছাড়ব না। আমাকে বড়ো হতেই হবে। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে যদি বাবার একটু সাহায্য করতে পারি। অর্থ আর শরীর – এ দুটোই আমার প্রতিবন্ধকতা। বাবা লড়ছেন আর্থিক প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে, আমি শারীরিক। আমি জানি জয় আমাদের হবেই।
আমি যখন বুড়ি হয়ে যাব, তখন কি স্মৃতির এই পাতাগুলো ঝরে যাবে? মনে কি কিছুই পড়বে না?
No comments:
Post a Comment