পার্থিব সকল সম্পদের তুলনায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সেরা। ইহা না থাকিলে মনুষ্যদিগের পাশবিক প্রবৃত্তি বহুল পরিমাণে বৃদ্ধি পাইত।
স্বভূমির ছোটোনাগপুর খণ্ড বিশেষত ইহার মালভূমি অংশ এই সৌন্দর্যের ভারে অবনত।
এক
বালক তার কৈশোরে সেই অংশের এক প্রান্তে বাস করিবার নিমিত্ত তাহার মধ্যম
অগ্রজ কর্তৃক নীত হয়। বালকটি শৈশবাবস্থা হইতেই সম্ভবত পুরুষানুক্রমে
স্বল্পভাষী ও লজ্জাশীল ছিল। এই স্থানে উপনীত হইবার কালে তাহার বয়ঃক্রম ১২
বৎসর ছিল। অত্র স্থানে উপস্থিত হইবার পর বালকটির সম্মুখে এই অনাবিল
সৌন্দর্যের দ্বার উন্মোচিত হইয়া তাহাকে একেবারে বিমোহিত করিয়া ফেলিল।
বালক
এই অংশে প্রথম প্রবেশ করে এক নিশীথে। তাহার বাসস্থান হইতে তরঙ্গমালার
ন্যায় শৈলশ্রেণি এবং সেই ভূধরের পাদদেশে বিস্তৃত অরণ্যানী অবলোকিত হইত।
প্রথম প্রভাতে এই দৃশ্য দেখিয়া বালক যেন সহসা আত্মনিমগ্ন হইয়া পড়ে।
স্বল্পভাষী যেন মুখর, বাচালে পরিণত হয়। শৈলশ্রেণির সহিত তাহার স্বগত সংলাপ
শুরু হয়। সেই ভূধর তাহাকে যেন হাতছানি দিয়া আমন্ত্রণ জানায়, সে-ও সেই
আমন্ত্রণ তৎক্ষণাৎ মনে মনে গ্রহন করিয়া রওনা দেয় পাহাড়ের উচ্চ শীর্ষে আরহণ
করিবার নিমিত্ত। দিন কাটিতে থাকে। প্রভাতে উঠিয়া তাহার অর্ধসমাপ্ত পাঠ
সাঙ্গ করিয়া বালক তাহাত নূতন বান্ধব দলমার সহিত আলাপ জুড়িয়া দিত। ক্রমে
সাহস বৃদ্ধি পাইতে থাকে। বনাঞ্চল অভিযানে বাহির হইবার অনুমতিও সে পায়।
অতঃপর তাহার দৈনিক দিনযাপনের অংশ হইয়া উঠিল বনভ্রমণ। আশ্চর্যান্বিত বালক
আবিষ্কার করিল বনভ্রমণে না যাইলে দিনটিকেই তাহার অর্থহীন মনে হয়। সেই
অরণ্যে জলাশয়, প্রস্তরস্তুপ, বিভিন্ন প্রকার ফলাদির বৃক্ষ, শাল, পিয়াল,
সেগুন, মহুল ইত্যাদি মহীরুহ দ্বারা আকীর্ণ ছিল। বালক কোনদিন হয়ত আম্রের
গুটিকা চয়ন করিয়া পরিধেয়র কোঁচড়ে ভরিয়া লইয়া আসিত। তাহাতে পরিধেয়টি এবং
তাহার কর্ণ উভয়ই বিচিত্রবর্ণ ধারণ করিত। কোনদিন-বা কোনো প্রস্তরস্তুপে
উঠিয়া ভাবিত বিশ্বের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করিয়াছে। প্রকৃতিদেবী তাহাকে
সম্পুর্ণরূপে গ্রাস করিয়া ফেলিলেন।
নিদাঘে প্রখর রৌদ্রে বালক কোনো
বৃক্ষতলে বসিয়া থাকিত। পাহাড়ে প্রতিফলিত রৌদ্র তাহার চক্ষু ঝলসাইয়া দিত।
তথাপি এক অমোঘ আকর্ষণে সে ঐ শৈলশ্রেণির প্রতি আকৃষ্ট হইয়া বসিয়াই থাকিত।
নিশীথে এক-একদিন পাহাড়ে দাবানল প্রজ্জ্বলিত হইয়া তাহার মনে এক মিশ্র
অনুভূতির জন্ম দিত। (দাবানল কাহাকে বলে বালকের কণিষ্ঠ অগ্রজ ব্যাখ্যা করিয়া
দিয়াছিল)। কখনও ভীত, কখনওবা বৃক্ষগুলির প্রতি দয়ার উদ্রেক হইত। ।
এই
স্থানে দক্ষিণ-পূর্ব রেলওয়ের একটি স্টেশন ছিল। জনপদটির নামেই স্টেশনটির
নাম ছিল, যদিও তাহা ওই স্থান হইতে প্রায় এক ক্রোশ দুরবর্তী ছিল। এইরূপ
মনোহরণ স্টেশন বালক তাহার পরবর্তী জীবনে আরও কয়েকটি দেখিয়াছে, চাইবাসা,
ম্যাকলাস্কিগঞ্জ, বারওবারডি, মহুয়ামিলন, ইকরা ইত্যাদি তথাপি বালকমনে প্রথম
দেখিবার অভিঘাত এখন স্পষ্ট। এই স্টেশন হইতেই তাহার প্রথম সঙ্গীহীন অবস্থায়
ট্রেনযাত্রা শুরু হয় কৈশোরের প্রান্তসীমায় একদা এই স্টেশন হইতেই ট্রেনে
চাপিয়া সে উচ্চশিক্ষা লাভের নিমিত্ত আসানসোল হইয়া রানীগঞ্জ আসে, যদিও তাহা
বালকটির কুক্ষিগত হয় নাই। আসানসোল হইতে পুনর্বার এই স্থানে ফিরিয়া আসিলেও
জীবন-জীবিকার তাড়নায় পুনরায় অন্যত্র গমন করে তাহার শৈশবের স্বর্গ ছাড়িয়া।
যেমন এক রজনীতে তাহার আগমন ঘটিয়াছিল, তাহার প্রথম অনেক কিছুর সাক্ষীকে সে
আর এক রাত্রে ছাড়িয়া গেল। আগমনের দিনও তাহাকে কেহ স্বাগত জানায় নাই, তেমনি
বিদায়ের দিনেও কেহ তাহাকে বিদায় দিল না, শুধু সেই অপরূপা প্রকৃতি ছাড়া।
No comments:
Post a Comment